Monday, 16 January 2017

এই সময়ে

এই সময়ে
যখন ঘরে ঘরে আলো জ্বলে,থেমে যায় পাখির ডানা মেলা,বহে সন্ধ্যার ঝিরিঝিরি হাওয়া তখন থেমে যাই আমি।
জানালার গ্রিলে ঠেকিয়ে মাথা মানুষ দেখি।কত রকম মানুষ,মায়ার মানুষ,মিছে মানুষ,প্রেমের মানুষ।
মানুষ সত্যি কি মানুষ! মানুষগুলোকে ডাকি না আমি,শুধু দেখি তারা হেঁটে চলে এ ঘর থেকে ও ঘর।
খেয়ালের খেয়ায় ভেসে চলা মানুষ,অন্ধকারের রঙীন মানুষ।
হাসি খেলার মিলন মেলার মহোৎসব,খুলে মুক্তার মালা কন্ঠ হতে ছুটে চলা মানুষ স্পন্দনের টানে।কেউ জানেনা
কি সুখে থেমে যায় পাখির ডানামেলা,কি সুখে সন্ধ্যায় বহে ঝিরিঝিরি হাওয়া।
কেউ জানে না এক নিমিষে কুয়াশার মালা জড়িয়েছি হৃদয়ে,কেউ জানে না গল্প এখন ফুলের দামে জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে।
মানুষ দেখি দুঃখ পেয়ে হেসে উঠা মানুষ,কষ্ট পেয়ে হেসে উঠা মানুষ,সুখ পেয়ে কেঁদে উঠা মানুষ,হাসির আঁড়ালে কান্না লুকানো মানুষ।
কষ্টগুলো আজ উল্টো হয়ে ঝুলে আছে বাদুরের মতন বট বৃক্ষে লাল লাল ফল হয়ে ঝরে পড়ে থাকে মাটিতে।
সুখগুলো আজ জেগে উঠা নতুন চর
জেগে উঠতে উঠতে ডুবে যায় জলে।
ধূমকেতুর মত হঠাৎ চলে যায়-বুঝতে না বুঝতে
বুঝে যাই ওটায় সুখ !
আমি শুধু বুঝিনা মানুষ-কেমন করে দুঃখ পেলে কাঁদে,কেমন করে হাসিতে লুকায়,কেমন করে হেঁটে যায় এ ঘর থেকে ও ঘর।
মানুষের ভিড়ে আমি মানুষ খুঁজি, সত্যের মানুষ,সাদা মানুষ,রঙীন মানুষ,মানুষ দেখি।
মানুষগুলোকে মানুষ ভেবে কথা বলতে গিয়ে থেমে যাই।
মানুষগুলো আরেকটা মানুষকে কি সাবলীলভাবে নিত্য নতুন পরিকল্পনা নিয়ে হত্যা করছে।
একদল মারছে অন্য আরেকদল মানুষকে।মরে যাচ্ছে নিরীহ মানুষ,মরে যাচ্ছে ভীত মানুষ,মরে যাচ্ছে সাহসী মানুষ।তবুও তারা মানুষ তো।যে যেমন মানুষই হোক না কেন কেউ কি মরতে চায়,মরে যাবার আগ মুহূর্তে মানুষ চায় খুব করে আরো একটু বেঁচে থাকতে।
বেঁচে থাকার জন্য শেষ চেষ্টা টুকু করে।সেই সময়ে এলোমেলো হয়ে মনে পড়ে হয়ত একটি নীল ফুল।
একটি লাল জামা।একটি শিশুর অবুঝ কান্না কিংবা অন্ধকার মাটির ঘরের নিস্তব্ধতা।
এভাবেই কেটে যায় সময়।পার করে জীবনের অন্তিম মুহূর্ত।
আলো আঁধারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে আতংকগ্রস্ত দুটি মানুষ, একটি শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা একটি কুকুর।
ঘরের মাঝে স্বল্প আলো।শিশুটি মায়ের কোলে ঘুমুচ্ছে নির্ভরতায়.খুটখুট শব্দ ভেসে আসে কোথা থেকে যেন!
হঠাৎ একদল পায়ের শব্দ।আহাজারি।
অন্তঃসত্ত্বা কুকুরের জেগে উঠা।ঘেউঘেউ করে ডেকে উঠা।ক্রমশ পায়ের শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে যেন।কুকুরের মুখ চেপে ধরে শান্ত হতে বলে
মেয়েটি।
কুকুরের চিৎকার থামানো যায় না।
ধুমধাম দরজায় লাথি।খোল দরজা।মেহেরু দরজা খোল, আমি আমি। দেরি করিস না।
গলার স্বর টা চেনা লাগলেও অচেনা শোনায় এই মাঝরাতে।সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে দরজা খুলে দেয়।
সামনে দাঁড়িয়ে রহিমা খালা।
হাতে ছোট্ট লাইট।"কই শিগগির বের হও, আয় আমার সাথে"।
মেহেরু তার কোলের সন্তানকে কোলে নিয়ে নাজাতকে ডেকে তোলে।রহিমা খালার পিছু পিছু বের হয়ে যায়।বের হবার সময় দেঁয়ালে টিকটিকি ডেকে উঠে 'ঠিক ঠিক'।
পায়ের কাছ থেকে আরশোলা এদিক সেদিক ছোটাছুটি করে।নিজেকে আরশোলার মত মনে হয়।মেহেরু পেছন ফিরে দেখে তার কুকুর টা তাকিয়ে আছে মুখের দিকে।
লেজ নাড়ায়,রহিমা খালা হাত ধরে টেনে আনতে আনতে ঝোপের আঁড়ালে বসতে কই।
একটু বসার পর ভোলার মুখ টা ভেসে উঠে।কুকুরটার বাচ্চা হবার সময় হয়ে এসেছে।আজকাল এর মধ্যে বাচ্চা হবে।অথচ ওকে তো আনিনি।তবে ও বাড়ির ভেতরে নেই তো।মেহেরু উঠতে যায়,খালা হাত টান দিয়ে ধরেন,বলে ওই দ্যাখ।মেহেরু তাকিয়ে দেখে ওরা একে একে সব ঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে।চারিদিক আহাজারি।
চালিংপাড়ায় ছোট ছোট বন আর টিলা দিয়ে ঘেরা।তার মাঝে ছোট ছোট ঘর।বনের শেষে পশ্চিমপাশের দিকটায় মেহেরু আর রাজিনের ছোট্ট সংসার।নাজাত রাজিনের ছোট বোন।বাবা মা নেই।জীবন বলতে ওই তিনজন।পেশায় একজন খাবারের দোকানদার।
প্রতিদিন সন্ধ্যা হবার আগেই বাড়ি ফিরে রাজিন।ঘরে ফিরে তার প্রথম কাজ বউয়ের হাতের এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত খাওয়া।হোক শীত হোক গ্রীষ্ম তার শরবত চাই।"বুঝলা মেহেরু, শরবত খেলে শুধু পরাণডা জুড়ায় না,সেই সাথে জুড়ায় মাথাডাও"কথাটি বলে আর হো হো করে হেসে উঠে।মেহেরুর কাছে সে হাসি দৈত্যের মত লাগে,তবুও সে হাসি তার বড্ড ভালো লাগে।
আকাশ ভরা জ্যোৎস্না নামে যেদিন সেদিন রাজিন উঠানে মাদুর বিছিয়ে গান ধরে,আর কই "'ও বউ! এই দিকে আয়! তোর চুলডা আঁচড়ায় দেয়"।রাজিন মাথায় হাত বুলিয়ে, চুলে বিলি কেটে, তেল মাখিয়ে ওর চুল বেঁধে দেয়।মেহেরুর বুকের ভেতর থেকে ওঠে আসে পরম সুখের শ্বাস।রাজিনের সব কিছু ভালো লাগে মেহেরুর।
বাহিরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে,আকাশ যেন ফুটো হয়ে গেছে।পানি পড়ছে তো পড়ছে।থামছে না।বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে মেহেরুর সন্তান হবার ব্যথা যেন বেড়েই চলেছে।সকালের দিকে বৃষ্টি কমে আসে,ফজরের আযান দেবার সময়ে সন্তানের জন্ম হয়।এই দেশে তো আযান হয় না, তাই রাজিন ঘড়ি দেখে বুঝে এখন ফজরের সময়।
রাজিন তার সন্তানকে কোলে নিয়ে নাম দেয় বেলাল।
রাজিনের কোলে খুব অল্পকিছুদিন হাসি খেলায় মেতে উঠে বেলাল।তবে খেলাটা জমে উঠে না শুধু ওদের জন্য।ওরা কখনো'য় মুসলমানদেরকে মেনে নিতে পারিনি।বেঁচে থাকাটা শুধু নিঃশ্বাস আর প্রশ্বাসের মাঝে আটকা পড়ে আছে।এ কেমন বেঁচে থাকা জানিনা। বেঁচে থাকার তাগিদে সব সহ্য করে শুধু বেঁচে আছে।কোথাও কোন অধিকার নেই, আছে শুধু মুখ বুঁজে সহ্য করা সীমাহীন কষ্ট।
ঘটনার দিন রাজিন আর গুটি কয়েকজন মুসলমান লুকিয়ে একটা ঘরে নামায পড়ছিল।আর সেই নামাযের ইমামতি করছিল রাজিন।ওরা রাজিনকে সহ বাকী সবাইকে হাতে পায়ে দঁড়ি বেধেঁ টানতে টানতে নিয়ে যায়।শুধু মুসলমান হবার অপরাধে নির্যাতনের পর নির্যাতন করে উল্লাসে মেতে উঠে ওরা।অন্যান্যরা জেল হতে বের হতে পারলেও রাজিন আর বের হতে পারিনি।মেহেরু আর জানতে পারিনি রাজিন বেঁচে আছে কি নেই।তবুও সে বিশ্বাস করে রাজিন ফিরবে একদিন।
সকাল হয়ে এসেছে।গতকালের সেই তান্ডব লীলায় প্রশস্ত পথ জুড়ে শুধু পোড়া ধ্বংসস্তুপ আর মৃতদেহ।
গরু-ছাগলের।কুকুরের।মানুষের।বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে উঠে।ভোলার( কুকুর) কথা মনে আসে।ঘরের কাছে গিয়ে দেখে পোঁড়া ঘরে দরজার কাছটায় মরে পড়ে আছে তার ভোলা।
রহিমা খালা মেহেরুর হাত ধরে টানছে।ছুটছে ওরা। একটু আশ্রয়ের আশায়।নদী পার হতে পারলে নাকি ঠাঁই পাওয়া যাবে।কালো মেঘগুলো হতে অবিরল ধারায় বৃষ্টি নেমেছে।ভিজে যাচ্ছে পথ ঘাট,অসহায় মানুষগুলো ছুটছে। অবিরল বৃষ্টির ধারা বাড়িয়ে দিচ্ছে তাদের অসহায়ত্বকে।অগনিত মানুষ তাদের এই অসহায়ত্বকে পায়ে ঠেলে সামনে এগিয়ে চলছে।বেশির ভাগ নারী,মধ্যবয়সী, শিশু।ওরা পালাচ্ছে।
ছুটছে তো ছুটছে।রহিমা খালা আর হাঁটতে পারছে না। রাস্তায় দুবার পড়ে গেছে।
রাত নেমে এসেছে।মেহেরুর সন্তান ক্ষুধার জ্বালায় সন্তর্পণে চিৎকার করছে।নাজাত কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছে।মেহেরুর মনে হচ্ছে জীবনের পথ এখানেই থেমে গেছে।
হঠাৎ একসঙ্গে অনেক মানুষের আত্মচিৎকার। হেলিকাপ্টার থেকে আকস্মিক বোম পড়ছে।বাজছে মৃত্যুর পদধ্বনি।
আতঙ্কিত সবাই এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে।ভোরের আলো ফুটছে।মেহেরু হারিয়ে ফেলেছে রহিমা খালা আর নাজাতকে।
চোখের সামনে এদিক সেদিক শুধু মানুষের লাশ আর লাশ।তবুও মেহেরু বেলালকে বুকে নিয়ে এগিয়ে চলছে।
চেনামুখগুলো ভাসছে,বাবা।মা।রাজিন।নাজাত।রহিমা খালা।অন্তঃসত্ত্বা কুকুর।
বেলাল কাঁদছে।
শেষরক্ষাটা আর হয়নি।অনেক মানুষ পার হয়েছে নদী।নদীর অপারের গল্পটা জানতে পারে নি আর কেউ।মেহেরু নদী পার হতে পারিনি।পার হবার আগেই মেহেরু পার হয়ে গেছে জীবনের বহমান নদী।মেহেরু ঘুমিয়ে গেছে চিরদিনের জন্য।চলে গেছে চিরপ্রশান্তির দেশে।যেখানে আর কেউ আলাদা করতে পারবে না রাজিন থেকে।ওরা মেহেরুকে পেছন থেকে গুলি করে।মেহেরু শুয়ে আছে। তার বুকের উপর বেলাল কাঁদছে।কাঁদতে কাঁদতে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা হিসেবে খুঁজে নিচ্ছে মায়ের বুক থেকে খাবার।আযান হচ্ছে পৃথিবীর কোথাও।যেখানে মানুষ নামাযের জন্য দাঁড়াতে পারে, যেখানে কোন প্রাণী মারা গেলে আন্দোলনের জোয়ার উঠে,যেখানে মানুষ বেঁচে থাকে মানুষের মত মানুষ হয়ে।

Thursday, 1 December 2016

আমাদের শহর


কেন জানি আমরা ছিলাম একটু উল্টো। নিয়ম করে সবার মত তুমি তুমিতে সম্পর্ক আটকে ছিল না।আমাদের সম্পর্ক ছিল তুমি আপনিতে।ও আমাকে আপনি বলত,আর আমি বলতাম তুমি।আপনিই বেশ-তুমিতে নয়।বাহিরে একসাথে দেখলে যে কেউ কনফিউজড হয়ে যেতে পারে।তবুও সে প্রথমে বলে নিল "আমাকে তুমি বলতে পারবে না,আপনি বলবে।আর আমাকে বলতে হবে তুমি।"এ কেমন অনাচার বলতে পারো মেয়ে আমি-আমাকে শুনতে হবে আপনি।আর বলার সময় তাকে বলতে হবে তুমি!
সব মেনে নিলাম।মনে হল সে যেটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে সেই হোক। ক্ষতি নেই।

জানালার পর্দা সরানো নেই তার আগে বুঝে গেছি আজ পূর্ণিমা।এই পূর্ণিমা এলে আমি কেমন করে যেন বুঝে যাই!আমি আমার মাঝে থাকিনা।আমার তখন মনে হয় শুধু একটু বাহিরে যেতে পারতাম।আমিও ভেসে যেতে চাই চাঁদের রূপালি আলোয়।আসলে মনের অনেক কথা,অস্থিরতা,সব মনে'তেই থেকে যায়।আমার ওকে বলতেও লজ্জা লাগে।কিন্তু সেদিন রাতে হঠাৎ মনে হল -আজ আমাকে বলতেই হবে আমি বাইরে যাব।আমি শহরটাকে দেখব।আমাদের শহর।এই শহর মন্দ নয়,আকাশ দেখা যায়, দেখো চাঁদ মেঘের আড়ালে লাজে ঢেকে ঢেকে রয়।এই শহর, আমার, এই শহর আমাদের।

সত্যি সেদিন বাহিরে ছিল চমৎকার জ্যোৎস্না।এমন জ্যোৎস্নায় নিজেকে বন্দী রাখা যায় না।ঝিরিঝিরি মিষ্টি বাতাস,যেন দূর থেকে সে বাতাসে ভেসে আসে হাসনাহেনার সুবাস।
রাত প্রায় বারোটা।আমি আমার সমস্ত দ্বিধা একপাশে সরিয়ে রেখে নিঃসংকোচে তূর্যকে বললাম "এইইইই শুনছ।"
সে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিল।
বলল"হু শুনছি তো!
কিছু বলবেন?"
আমি বললাম তারে "আমার খুব বাহিরে হাঁটতে যেতে ইচ্ছে করছে।সত্যি সত্যি যেতে ইচ্ছে করছে!"

সে বলল "আচ্ছা,চলেন,তবে লুঙীটা বদলে নিই।"

"ইয়াহুউউউউউউ
লুঙী নো প্রবলেম"

তূর্য বলছে"আমি লুঙী পরে বাহিরে যাই না,আপনি রেডি হোন আমি প্যাণ্টটা পরে আসছি।"

আমি শাড়ি পরে নিলাম।হলুদ রঙের শাড়ি।মেয়েরা নীল শাড়ি পরে,আমি পরেছি হলুদ।আমি কেন হলুদ শাড়ি পরেছি সে কথা বলব না,জানি সোডিয়াম আলোর নীচে সেই হলুদ আর হলুদ থাকবে না,তবুও হলুদের উপর হালকা হাতের কাজের শাড়িটা পরে নিলাম।তবে মনে হল হলুদ নিশ্চয় তার পছন্দ হবে না।

তার আর আমার, আমাদের এখনো জানা হয়ে উঠে নি কার কি পছন্দ!
আমি খোঁপা বেঁধে নিলাম,আর চোখেতে একেঁ নিলাম একটুখানি কাজল।কাজল পরতে আমার খুব ভালো লাগে।আয়নায় যখন নিজের কাজল দেয়া চোখ দেখি তখন একটা মায়া মায়া লাগে।মনে হয় মেয়ে তুমি কাজল পরো তোমার চোখেতে।

আমি শাড়ি পরে তার সামনে এসে দাঁড়ালাম,সে একটিবারের জন্য বলল না আমায়, কেমন দেখাচ্ছে,সে বলল"এসেছেন,এত তাড়াতাড়ি! মেয়েদের রেডি হতে তো দেরি লাগে,হাহাহা।"
তার সেই হাসিতে আমি রাগ করতে পারতাম কিন্তু ইচ্ছে হল না।আমি বাহিরের ভেসে যাওয়া জ্যোৎস্নার মুগ্ধতায় ডুবে গেলাম।
তূর্য আর আমি,আমরা হাঁটছি পাশাপাশি।
রাস্তার পাশে এখানে ওখানে কেউ কেউ ঘুমায়।অদূরে কিছু কুকুর চিৎকার করছে।
হাঁটছিআমরা,আমাদের শহরে।এই শহরের নাম আমাদের শহর।

"আচ্ছা রাস্তার কুকুরগুলা ঘুমায় না।"

তূর্য ঃ"নাহ তো"।

আমি বলছি "এবার ঠিক শীত পড়‌বে।"

তূর্যঃ"হুম হয়ত।"দেখ তূর্য " সো‌ডিয়াম বা‌তি‌তে শহরটা বেশ র‌ঙিন"

"চমৎকার!"

"জীবন বড় সুন্দর!"

"আমি হারিয়ে যাচ্ছি সত্যি।"

হারাবেন কেন? রা‌তের প‌রিচ্ছন্নতায় এই শহ‌রে
হারা‌নোর ভয় নেই।আমিপথ চি‌নি‌য়ে দেব।"

আমি হাঁটছি তো, আরআর এদিক ওদিক দেখছি,দেখছি এই শহর কেমন।মাঝে মাঝে কথা হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে অনেক পথ হেঁটে এসেছি।

আমি বলছি"এইইইএ তূর্য একটা গান ধর তুমি।"

আমি পরিপূর্ণ ভাবে হারিয়ে যাচ্ছি ।আমি উচ্ছ্বসিত, আমি চঞ্চলা হরিণীর মত এদিক সেদিক চাইছি শুধু।আমি নিজেকে সামলাতে পারছিনা আজ।

"চাঁদের হা‌সি বাধ ভে‌ঙে‌ছে ।
উপ‌চে প‌ড়ে অা‌লো। ও ও ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধ সুধা ঢা‌লো। ও ও ও চাঁদের হ‌া‌সি..."

ও যখন গান গায় আমার ভীষণ ভালো লাগে।জীবনের রঙগুলো ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে।ভালোবেসে একটা মানুষ আমার জন্য গান করছে-এর চেয়ে ভালো উপহার আর কিই বা হতে পারে!!আমি খুশি হুই যখন ও গান গেয়ে উঠে।

"এইইই চল বসি। একটু জিরিয়ে নেয়।আর একটু চা খাই।"

"লাল মগে?
"হুম্মম্মম সামনেই হা‌রি‌কেন জ্বালা‌নো ছোট্টদোকা‌ন,
ও‌দের মগ লাল আছে কিনা তা তো জানিনা।"

"আচ্ছা।"

তূর্যঃহুম্মম।

শুনেছ প্রহরী রা বাঁশি দিচ্ছে।

"চাচা দুইটা লাল চা।
হালকা লিকার কিন্তু মগ ভ‌র্তি।"

"হুম্মম্মম্ম
মগ ভর্তি!"
" অবশ্যই কাঁচা পা‌তির!"

এই তূর্য আমি তো কাঁচা পাতির চা কখনো খাইনি।কথা বলতে বলতে এর মাঝেই চা এসে গেল।আমি চা মুখে নিয়ে"হুম্মম্মম মজা তো!"আচ্ছা কাঁচা পাতি কি?কাঁচা পা‌তি মা‌নে হ‌চ্ছে গরম জল দি‌য়ে লিকার ছাড়ান। চুলায় জ্বাল ক‌রে না।

"আচ্ছা।"হুউউ চিনি হয়ছে তোমার টা?"

"হ্যাঁ! অা‌মি চি‌নি একটু কম খাই"

"আমিওঅঅঅঅঅঅ"

"চিমটি।"

তূর্যঃ"খাম‌চি।"
এই শুনো তূর্য -চা বানানো চাচার মনে হয় ঘুমে ধরেছে"
হিহি"
।"চাচা আপনিও চা খান।"

"চাচা!বাড়ি কতদূর?
বাড়িতে চাচী আছে???"
এতসব প্রশ্ন চাচাকে করেছিলাম আমি।তূর্য কিছুই বলল না,ও শুধু হাসল,আর বলল "আপনি কিন্তু ভালো'য় গল্প করতে পারেন!জানেন "চাচা জিগায় মে‌য়েডা অাপনার কে লা‌গে?"
"হাহাহ"
"বলে দাও যা খুশি।"
তূর্যঃ"হুমম"।
"আচ্ছা!তুমি কি বললে উনাকে?"
তূর্যঃ"হুম"।"আমি চাচাকে একটা ছবি দেখালাম শুধু।তাতেই চাচা বুঝে গেল।"
"কি বুঝল?ঠিক আছে!যাবার আগে চুপটি করে শুনে যাব চাচার কাছে!
চাচার বউমা পছন্দ হল?"
"বলবে না তাই তো?যাও।
"বল না! কানে কানে চাচাকে যা বললে!"
তূর্যঃ"কিছু কথা থাক না গোপনে!"
"হুম্মম"
"চাচাকে টাকা দিয়ে দাও।চল উঠি এখানে অনেক মশা!"
আমি চাচার কাছ থেকে বিদায় নিলাম"চাচা আসিইই কেমন,আস সালামু আলাইকুম।"
তূর্যঃ"হাঁটবেন নাকি রিকশা নেব?"
"আর একটু হাঁটি,ক্যামন!"
তূর্যঃ "হুম"
"আচ্ছা,শোন কোন রিকশা দেখছি না তো!"
তূর্যঃ"সামনে মোড়ে পাওয়া যাবে।"
"আচ্ছা চল।"রাতের নিজস্ব সৌন্দর্য আছে!"
তূর্যঃ"বুঝলেন নিশ্চুপ আলো আধাঁর।‌রিকসার টুং টাং শব্দ মা‌ঝে মা‌ঝে।প্রিয়জনের উপস্থিতি সেই সৌন্দর্য বাঁড়িয়ে তোলে।"
"হুম্মম,রিকশা ডাক দাও।"
তূর্যঃ"হুউউম।"
"ডাকোনা,হাঁটতে পারছি না আর!
তূর্যঃ"রিকশা পে‌তে হ‌লে অা‌রো স‌াম‌নে যে‌তে হ‌বে।"
"আচ্ছা চল।"
আমি গুনগুনিয়ে গান গাচ্ছিলাম-"এ পথ য‌দি না শেষ হয় ত‌বে কেমন হত তু‌মি বল‌তে‌া!"
গান গায়ছেন তো একটু জোরে গায়লে এই অধম শুনতে পেত!
আমি বললাম এই শুনো,এত শুনে কাজ নেই।শুনো
-"হুম ব‌লেন।"
"ওই ব্রিজের ওই খানে একটু দাঁড়ায়?
ওই যে নিচ দিয়ে নদী বয়ে যায়
দাঁড়াবে?"
তূর্যঃ"ওটা ব্রিজ না কালভার্ট!"
"চল না!ওই হল,ব্রিজ বা কালভার্ট,একটা হলে তো হল."
তূর্যঃ"হুম চলুন।চুপকেন?"
কই চুপ,আমিই তো বকবক করছি।তুমি তো চুপ, শুধু হ্যাঁ, হু করছ! আমার একটা ইচ্ছে আছে,তোমায় আমি হুম,হুম গুলিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়াব!
"আচ্ছা খাওয়াবেন।
মেম সাহেবা আজ অনেক বাতাস তাইনা?
হুম,ঠিক বলেছ তূর্য,আসলে আমি
ভাবছিইইইইইইইইই তো,মাঝে মাঝে
ভাবলে এমন চুপ হয়ে যায়!
তূর্যঃ"অামার তো ঠান্ডা লে‌গে যা‌চ্ছে,কিন্তু
বাতাসের ঘ্রাণ নিই,কিন্তু ভালও লাগ‌ছে।"
তোমার ঠান্ডা লাগছে তাহলে চল উঠি।
তূর্যঃ"না না থাক।"
"রিকশা নাও।"
তূর্যঃ"নাহ!থা‌কি একটু!"
"আচ্ছা "
"বাসায় যাবে?"
তূর্যঃ"‌রিকশা
অাসুক অা‌গে, তারপর তখন যে‌তে ই‌চ্ছে কর‌লে যাব।"
"আচ্ছা।"
"এখানে আমার কাছে এসে দাঁড়াও শীত কম লাগবে।
কি কম লাগে ঠান্ডা?
বেশ বাতাস!"
তূর্যঃবেশ বাতাস!কাঁপুনি দি‌য়ে যায়!
এইইই তূর্য আকাশের চাঁদ জলের মাঝে খেলছে তাইনা?
হুম্মম্ম.
চল চল আর না!বাতা‌সে জ‌লের খেলায়
ঠান্ডা লেগে মায়ের কাছে বকা শুনতে হবে তো!
তূর্যঃ"আইচ্ছা চলেন।"
তূর্যঃ"এই রিক্সা যাবা?ওই খা‌লি!"
"আমি ডাকি?"
তূর্যঃ"হুম ড‌া‌কেন।"
"এইইইইই মামা যাবেন?"
"এত রাতে কই যাইবেন?
তেমন কোথাও না, শুধু ঘোরাবেন আমাদের কে?"
তূর্যঃ"‌কি রিক্সাওয়ালার ভা‌গ্নি, ভাড়া তো দেয়াই লাগব না!হাহাহা!"
"হুম তুমি দিবা!"
তূর্যঃ"আমি দিব কেন?"
"ইশশ,তুমিই দিবা,আজ কোন ভাড়া ঠিক হবে না
আজ ঘুরতে বের হয়েছি যে!"
তূর্যঃ"‌যেম‌নে ডাক দি‌লেন মামা! ওতো ভাড়াই নে‌বে না"
"ঘুরব।"
তূর্যঃ"হুম।"
"যাও উঠব ই না!তুমি একা ঘুরো
আমায় বাঘে খাক, বেশ হবে!"
তূর্যঃ"হাহাহা
হাহাহাহ
বা‌ঘে খা‌বে কেন?"
"তুমি তো একাই ঘুরবা?"
তূর্যঃ"না,অাাজ দুজ‌নে!"
যাবই না,রাগ করেছি।
তূর্যঃ"কেন? এত রাগ কেন মেয়ে!"
"এই মামা আমি যাব চলেন উনি যাবেনা।
আমি রিকশায় উঠে বসলাম।"
তূর্যঃ"এই দেখ দেখি,আমিও যাব তো, আমাকে নিবেন নাহ!"
"উঠে বসলেই হয়!উঠো উঠো!"
এতরা‌তে একা প‌থে ফে‌লে গে‌লে ভূতে খা‌বে,হাজার হোক একটাই তুমি!
তূর্যঃএই তো উঠেছি আমি,আর ঢং করতে হবে না।"
"বস,বসতে পেরেছ তো?দেখ সাইড দিতে গিয়ে আবার পড়ে যেও না
তূর্যঃ"পড়ে গেলে ধইরেন।"
"ইশশ
পড়ে যাবে কেন?
জায়গা তো আমার বেশি লাগে।"
তূর্যঃ"যদি পড়ে যায়?"
" আমি তো মোটু"
তূর্যঃ"হুম"
"পড়বে না।ইনশাআল্লাহ্‌"
তূর্য"আমার কমই জায়গা লাগে!"
আমি বললাম"হুম লাগবেই তো,তিনবেলা রুটি খাও,রুটি খাওয়ার ফল,হাহাহ।"
তুর্যঃ"রুটি খাওয়া ভালো।"
আমি ঃ"ভালো সে তো নিজের বেলায়,আমাকে তো বল না!
একাই খাও।"
তূর্য ঃ"হুম,আপনিও খান!"
আমি তূর্যকে বললাম"হুম,খেতে হবে বুঝেছ!ওমন জড়োসড়ো হয়ে বসেছ কেন?"
"রুটি খাওয়ার সুবিধা হল একটা আইটেম হলে চলে।"
"তূর্য ভালো করে বস।"
তূর্য বলল "হুম,I m easy।"
আমিঃ"হুম্ম
তাই তাই।"
এরপর আমি বললাম আমার ঘুম ঘুম আসছে।তোমার কাঁধে একটু মাথা রাখি?
তূর্য ছোট্ট করে বললঃ ওকে।
তূর্যের কাঁধে মাথা রাখলাম।আমি এ ক'দিনে জেনে গেছি, খুব ভালো করে যে -তূর্য নিজ থেকে আমার হাত ধরতে চাইবে না।আমি কোন অনুমতি না নিয়েই সকল দ্বহুম ভালো 'য় তো গাইলে!
আমার জন্য তো গায়ছিলে?
"হ্যাঁ তো আপনার জন্যই গেয়েছি,এখানে তো আর আমার অন্য কেউ নেই যে...
আমি বললাম কি গলায় কি, সেটা না ভাবলেও চলবে
বুঝেছ
গলা নিয়ে আর কিচ্ছু শুনতে চাইনা।
"জ্বী, ওকে"
আমি একটু রাগ করে বললাম "তূর্য, তুমি তো পচাঁ -আমি যা বলি সব মেনে নাও"
তুর্য কি বলল আমায় "হুম খুব খারাপ"
আমি বললাম এমন করলে ঝগড়া বাঁধবে না তো!
তুর্যের সোজাসুজি উত্তর আমি কাউকে জোর করিনা।
আমি বললাম ইশশ,হয়েছে।চল বাসায় চল।
হুম চলেন।
আমার ঘুমে ধরেছে।তুর্য বলছে ওর চোখে ঘুম নেই।আমি বললাম বাসায় চল, ঘুম আসবে ঠিক দেখ।জানো
স্নিগ্ধ বাতাসে আমার ঘুম ঘুম এসে গেছে।বুঝলে আমার মনে হচ্ছে হাঁড়েও বাতাস লাগছে।
হুম বুঝলাম।




আচ্ছা! তুর্য বল তো এই আকাশ কার??
এই আকাশ আমাদের।
তুর্য এই মায়াবী রাতে সীমাহীন মুগ্ধতা ভর করেছে বল।হুম
আমার যেতে ইচ্ছে করছে না আর তূর্য, কিন্তু তবুও বাসায় যাব। চল।তোমার ঠান্ডা লাগছে।
এই মামা রিকশা ঘোরাও।
একটা কথা তূর্য, আমি বাসায় গিয়ে ছাদে যাব কিন্তু।আমি ঠিক করেছি আমি ঘুমাব না।আচ্ছা।
রিকশা থেকে নেমে গেলাম আমরা।অতঃপর কিছুক্ষণ পরে আমরা একে অপরের হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে উঠছি।এক ধাপ এক ধাপ করে উঠছি আমরা।তূর্য বলল"আস্তে আস্তে উঠেন,পাশের ফ্লাটে সবাই ঘুমিয়ে।"
সিঁড়ি আর ফুরায় না,তূর্য এদিক ওদিক তাকায়,তারপর উঠার মত আর সিঁড়ি নেই।সামনে বিশাল চাঁদ,মাথার উপর চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরি। আমি আর শাড়ি বদলায়নি,শুধু খোঁপাটা খুলে দিয়েছি।
তূর্যের হাঁচি লাগছে।ঠান্ডা লেগে গেছে।এই তূর্য ঘরে চল।"না মেমসাহেবা আমি আজ এখানেই থাকব,আপনার ঘুম এলে রেখে আসি?
তাহলে আমি তোমার কোলে মাথা রেখে ছাদে শুয়ে আকাশ দেখব,এইশহরের আকাশ, আমাদের আকাশ।যেখানে এই চাঁদের নিচে শুয়ে থাকবে একটি হলুদাভ প্রজাপতি ও তার নীলচে জোনাকি।
পৃথিবী ঘুমুচ্ছে,ঘুমুচ্ছে তূর্যের মেমসাহেবা।তূর্য চেয়ে আছে মেমসাহেবার দিকে, আর বসে বসে পাহারা দিচ্ছে যেন সে সুখের ঘুম ঘুমাতে পারে।মেমসাহেবা ঘুমুচ্ছে যেন মেঘের পালঙ্কে।পরম সুখে,ভালোবাসার ছোট্ট সংসারে।
মেমসাহেবা ঘুমাক,তূর্য পাহারা দিক-ওদের গল্প এইভাবে জমে উঠুক চাঁদ,নীলিমা কিংবা স্বপ্নময় বৃষ্টির রাত হয়ে..